ডিআরএস বা ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (Decision Review System) হলো ক্রিকেটে সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করার জন্য চালু করা প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য মাঠের আম্পায়ারদের সাহায্য করা এবং তাঁদের প্রাথমিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে তা শুধরে দেওয়া।
২০০৮ সালে ভারত ও শ্রীলঙ্কার টেস্ট সিরিজে প্রথমবার খেলোয়াড়দের রিভিউ নেওয়ার ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়, আর বীরেন্দর শেবাগ হন রিভিউয়ের মাধ্যমে আউট হওয়া প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যাটার। ২০০৯ সালের নভেম্বরে ডানেডিনে নিউজিল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট দিয়ে আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিআরএস চালু করে। ওয়ানডেতে ডিআরএস আসে ২০১১ সালে, আর টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে ২০১৭ সালে।
ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম কী?
কোনো দল ডিআরএস নিলে সে মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে। এরপর তৃতীয় আম্পায়ার (টিভি আম্পায়ার) স্লো-মোশন রিপ্লে, বল-ট্র্যাকিং ও এজ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সাহায্যে সিদ্ধান্তটি যাচাই করেন।
রিভিউ নিতে হলে ফিল্ডিং দলের অধিনায়ক বা আউট দেওয়া ব্যাটারকে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে দুই হাতে “T” চিহ্ন দেখাতে হয়। সময় পেরিয়ে গেলে আম্পায়ার রিভিউ নাকচ করতে পারেন। খেলোয়াড় বাইরে থেকে (যেমন ড্রেসিংরুম থেকে) ইশারা পেয়ে রিভিউ নিচ্ছেন বলে মনে হলেও আম্পায়ার রিভিউ বাতিল করতে পারেন।
ডিআরএসে কোন কোন প্রযুক্তি ব্যবহার হয়?
- হক-আই (বল-ট্র্যাকিং): এলবিডব্লিউর ক্ষেত্রে বলটি কোথায় পিচ করেছে, কোথায় প্যাডে লেগেছে এবং স্টাম্পে লাগত কি না, তার সম্ভাব্য গতিপথ দেখায়।
- আল্ট্রা-এজ / স্নিকোমিটার: শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে বোঝা যায় বল ব্যাটে বা গ্লাভসে লেগেছে কি না।
- হটস্পট: ইনফ্রারেড ক্যামেরায় বল যেখানে লেগেছে সেখানে উজ্জ্বল দাগ দেখা যায়। সব সিরিজে এটি ব্যবহৃত হয় না।
ডিআরএস কীভাবে কাজ করে?
তৃতীয় আম্পায়ার প্রথমে দেখেন বলটি বৈধ ছিল কি না, অর্থাৎ বোলার নো-বল করেছেন কি না। বল বৈধ হলে তিনি চ্যালেঞ্জ করা সিদ্ধান্তটি যাচাই করেন, সঙ্গে আউটের অন্য উপায়গুলোও দেখেন।
এলবিডব্লিউ: প্রথমে আল্ট্রা-এজ দিয়ে দেখা হয় বল ব্যাটে লেগেছে কি না। না লাগলে হক-আই দিয়ে বলের সম্ভাব্য পথ দেখা হয়। বল লাইনে পিচ করলে, লাইনে প্যাডে লাগলে এবং স্টাম্পে আঘাত করতে দেখা গেলে তবেই নট-আউট সিদ্ধান্ত বদলে আউট হয়।
ক্যাচ: বল ব্যাটে লেগেছে কি না তা দেখা হয়; লাগলে ক্যাচটি পরিষ্কার ছিল কি না, তা যাচাই করা হয়। বল ব্যাটের বদলে প্যাডে লাগলে তৃতীয় আম্পায়ার এলবিডব্লিউর প্রক্রিয়াও অনুসরণ করেন। ২০২৫ সালের জুনে আইসিসির নতুন প্লেয়িং কন্ডিশনস অনুযায়ী, কট-বিহাইন্ডের রিভিউ চলাকালে ব্যাটার এলবিডব্লিউতে আউট প্রমাণিত হলে “আম্পায়ার্স কল” দেখালেও আউটই থাকে।
আম্পায়ার্স কল কী?
প্রযুক্তিও শতভাগ নিখুঁত নয়। হক-আই পর্দায় যে পথ দেখায়, তা বলের সম্ভাব্য অনেক পথের একটি অনুমান মাত্র। তাই ডিআরএসে “আম্পায়ার্স কল” নিয়ম আছে, যা মাঠের আম্পায়ারকে সন্দেহের সুবিধা দেয়।
এলবিডব্লিউর কাছাকাছি ক্ষেত্রে, যেমন বল-ট্র্যাকিংয়ে বল স্টাম্পে সামান্য ছুঁয়ে যেতে দেখা গেলে, মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। সিদ্ধান্ত বদলাতে হলে বলের ৫০ শতাংশের বেশি অংশ উইকেট জোনে আঘাত করতে দেখা যেতে হবে। ২০২১ সালের এপ্রিলে আইসিসি উইকেট জোনের উচ্চতা বাড়িয়ে স্টাম্পের একেবারে ওপর পর্যন্ত করে দেয়। আম্পায়ার্স কলের কারণে সিদ্ধান্ত না বদলালে রিভিউ নেওয়া দলের রিভিউ নষ্ট হয় না।
একটি দল কয়টি ডিআরএস পায়?
| ফরম্যাট | ব্যর্থ রিভিউয়ের সীমা |
|---|---|
| টেস্ট | প্রতি ইনিংসে ৩টি |
| ওয়ানডে | প্রতি ইনিংসে ২টি |
| টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক | প্রতি ইনিংসে ২টি |
সফল রিভিউয়ের কোনো সীমা নেই। রিভিউয়ের পর সিদ্ধান্ত বদলালে দলের রিভিউ অক্ষত থাকে। কোভিড-১৯-এর সময় অভিজ্ঞ নিরপেক্ষ আম্পায়ারের ঘাটতির কারণে টেস্টে একটি অতিরিক্ত রিভিউ দেওয়া হয়েছিল, যা পরে স্থায়ী হয়ে যায়।
ডিআরএস নিয়ে বড় বিতর্ক
ডিআরএস বিতর্কের বাইরে নয়। ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে শচীন টেন্ডুলকারের এলবিডব্লিউ সিদ্ধান্ত রিভিউয়ে বদলে যাওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে কেপটাউন টেস্টে ভারতও একটি ডিআরএস বিতর্কে জড়ায়। রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে ডিন এলগারের এলবিডব্লিউ সিদ্ধান্ত রিভিউয়ে উল্টে যায়, যদিও খালি চোখে মনে হচ্ছিল বলটি স্টাম্পে লাগত। বল-ট্র্যাকিংয়ে বলটি স্টাম্পের ওপর দিয়ে চলে যেতে দেখা যায়। ক্ষুব্ধ ভারতীয় খেলোয়াড়েরা স্টাম্প মাইকে সম্প্রচারকারীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে, সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করতেই ডিআরএস আনা হয়েছিল। বিতর্ক সত্ত্বেও খেলায় ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তথ্য হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬।
ইংরেজিতে পড়ুন: What is DRS in cricket?
